
নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট
সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গভীর রাতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে বিমানবন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপন ইমিগ্রেশন বিভাগের প্রধান সার্ভার রুমটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত।
এই দুর্ঘটনার ফলে বিমানবন্দরের কম্পিউটারাইজড ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম হাতে-কলমে (ম্যানুয়ালি) পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে কাজে ধীরগতি সৃষ্টি হওয়ায় যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তবে ফ্লাইট চলাচলের সময়সূচিতে কোনো প্রভাব পড়েনি।
অগ্নিকাণ্ডের বিবরণ:
বিমানবন্দর ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার (৫ এপ্রিল, ২০২৬) দিবাগত রাত প্রায় সোয়া ১১টার দিকে বিমানবন্দরের দোতলায় অবস্থিত এরাইভাল ইমিগ্রেশন বিভাগের সার্ভার রুম থেকে হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখেন কর্তব্যরত কর্মীরা। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। এতে বিমানবন্দরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে সিলেট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় এক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টার পর রাত সোয়া ১২টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে সার্ভার রুমের ভেতরে থাকা সব কম্পিউটার, সার্ভার মেশিন, সংবেদনশীল নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতি, এসি এবং আসবাবপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে যায়।
ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব:
অগ্নিকাণ্ডে সার্ভার রুমটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক প্রতিবেদনে আনুমানিক এক কোটি টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হলেও, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ তদন্তের পর জানা যাবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়া। ডিজিটাল সিস্টেম বন্ধ থাকায় সোমবার সকাল থেকেই সব যাত্রীর পাসপোর্ট ও ভিসা পরীক্ষা করার কাজ কর্মকর্তারা ম্যানুয়ালি করছেন। এতে প্রতিটি যাত্রীর জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য:
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “আগুন লাগার পরপরই আমাদের ফায়ার ফাইটাররা এবং সিলেট ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে সার্ভার রুমটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, “ইমিগ্রেশন সার্ভার অচল হওয়ায় আমরা ম্যানুয়ালি কাজ করছি। এতে কিছুটা সময় বেশি লাগছে, যা সাময়িক। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিস্টেম পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছি। তবে সুখের বিষয় হলো, কোনো ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়নি।”
সিলেট ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার জানান, “প্রাথমিক আলামত দেখে মনে হচ্ছে সার্ভার রুমের এসি বা বৈদ্যুতিক সংযোগের শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তদন্তের পর নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।”
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং জনপ্রতিনিধিরা। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ইমিগ্রেশনে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
জরুরি কলআউট: অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে সিলেট বিমানবন্দরে কম্পিউটারাইজড ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ। ডিজিটাল সিস্টেম পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ম্যানুয়ালি চলবে, যার ফলে কিছুটা সময় বেশি লাগতে পারে। যাত্রীদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
